রিক্সা মিস্ত্রী হয়েও প্রতিদিন ৭০ জনকে ফ্রি ইফতার খাওয়ান আব্দুর রাজ্জাক

রিক্সা মিস্ত্রী হয়েও প্রতিদিন সত্তর জন রোজাদারকে বিনামূল্যে ইফতার করান আব্দুর রাজ্জাক। খুলনার সোনাডাঙ্গা এলাকার এই সাধারণ মানুষটি মানবতার এক উজ্জ্বল এবং বিরল দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। বর্তমান সময়ে যেখানে অনেক বিত্তবান মানুষ সামাজিক দায়বদ্ধতা ভুলে নিজের স্বার্থ নিয়ে ব্যস্ত থাকেন, সেখানে একজন সামান্য মেকানিক হয়েও তার এই বিশাল হৃদয়ের পরিচয় এবং মহানুভবতা আজ পুরো সমাজকে এক দারুণ বার্তা দিচ্ছে। প্রতিদিনের হাড়ভাঙ্গা খাটুনির পর তার উপার্জিত কষ্টের অর্থের একটি বড় অংশ তিনি কোনো দ্বিধা ছাড়াই ব্যয় করেন আর্তমানবতার সেবায় এবং ক্ষুধার্ত মানুষের মুখে খাবার তুলে দিতে।
সোনাডাঙ্গার এক নিভৃত কোণে অবস্থিত তার ছোট্ট রিক্সা মেরামতের গ্যারেজ। সারাদিন সেখানে চলে লোহা-লক্কড় আর টায়ার-টিউবের কচকচানি। গ্রীজ আর কালিতে মাখা শরীর ও হাত নিয়ে নিবিষ্ট মনে কাজ করেন আব্দুর রাজ্জাক। কিন্তু সূর্য যখন দুপুরের তপ্ত ক্লান্তি পেরিয়ে পশ্চিমে হেলতে শুরু করে, তখন এই সাধারণ গ্যারেজের দৃশ্যপট অবিশ্বাস্যভাবে এক স্বর্গীয় আবহে বদলে যায়। রাজ্জাক তার কাজের সরঞ্জাম সরিয়ে সেখানে পবিত্র এক আয়োজন শুরু করেন। গ্যারেজের মেঝেতে সবুজ কাপড় বিছিয়ে পরম মমতায় তিনি সারি সারি সাজিয়ে রাখেন ইফতারের থালা। বিনম্র ভালোবাসা মেশানো এই আয়োজন দেখে বোঝার উপায় নেই যে এটি একজন সামান্য মিস্ত্রীর ব্যক্তিগত প্রচেষ্টার ফসল।
আব্দুর রাজ্জাকের এই মানবিক যাত্রার পথচলা শুরু হয়েছিলো আজ থেকে অনেক বছর আগে, দুই হাজার ছয় সাল থেকে। শুরুতে বেশ ক্ষুদ্র পরিসরে এই ইফতারের আয়োজন করা হলেও বর্তমানে তিনি প্রতিদিন গড়ে প্রায় সত্তর জন মানুষের ইফতারের সুব্যবস্থা করেন। তবে মাঝে মাঝে এই সংখ্যা অনেক বেড়ে যায় এবং কখনো কখনো তা দুইশো থেকে আড়াইশো রোজাদারকেও ছাড়িয়ে যায়।
তার ইফতারের মেন্যুতে থাকে হরেক রকমের পুষ্টিকর ও সুস্বাদু খাবারের আয়োজন। আপেল, আঙুর, আনারস, কলা ও ক্ষীরাই থেকে শুরু করে মুড়ি, চিড়া, ছোলা, আলুর চপ এবং বেগুনি- সবমিলিয়ে প্রায় চৌদ্দ থেকে পনেরো পদের ইফতার সামগ্রী সাজানো থাকে তার দস্তরখানে। আর তৃষ্ণা মেটাতে তিনি নিজের হাতে তৈরি করেন বরফ মিশ্রিত সুশীতল শরবত। প্রতি বৃহস্পতিবার এই আয়োজনে যোগ হয় আরও বিশেষ কিছু খাবার যেমন সুগন্ধি বিরিয়ানি, তেহারি বা খিচুড়ি, যার সুবাসে পুরো গ্যারেজ সংলগ্ন এলাকা মৌ মৌ করে।
সবচেয়ে আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই বিশাল এবং নিয়মিত সামাজিক কর্মযজ্ঞের জন্য তিনি কখনোই কারো কাছে আর্থিক সাহায্যের জন্য হাত পাতেন না। নিজের সাধ্যের মধ্যে যা জোটাতে পারেন, তা দিয়েই তিনি সাধারণ মানুষের মুখে হাসি ফোটানোর প্রাণপণ চেষ্টা চালিয়ে যান। কোনো ধরনের প্রচার বা লোক দেখানো খ্যাতির আকাঙ্ক্ষা তার মনে বিন্দুমাত্র নেই; কেবল আর্তমানবতার সেবা করার মাঝেই তিনি খুঁজে পান এক অপার্থিব আনন্দ। পথচারী থেকে শুরু করে দিনমজুর, রিক্সাচালক ও নিম্ন আয়ের মানুষ- সবার জন্যই তার গ্যারেজের দরজা সর্বদা উন্মুক্ত থাকে। ইফতারের আগ মুহূর্তে সবাই যখন গোল হয়ে বসে খাবারের অপেক্ষা করেন, তখন রাজ্জাক নিজে দাঁড়িয়ে সবার দেখাশোনা করেন।
রাজ্জাকের এই মহত্ত্ব কেবল ইফতার আয়োজনেই সীমাবদ্ধ নয়, তার মানবিকতার পরিধি আরও অনেক বিস্তৃত। প্রচণ্ড গরমের সময় তিনি তৃষ্ণার্ত পথচারীদের মাঝে নিয়মিত ঠান্ডা পানি বিতরণ করেন। এছাড়া অসহায় মানুষের প্রয়াণের পর কাফনের কাপড় সরবরাহ করা এবং দাফনের যাবতীয় আনুষঙ্গিক খরচ তিনি নিজ কাঁধে তুলে নেন। তার এই নিঃস্বার্থ পরোপকার দেখে অনেক বিত্তবান মানুষও অনুপ্রাণিত হচ্ছেন। সম্প্রতি একজন প্রবাসী ব্যক্তি তার সততায় মুগ্ধ হয়ে তার মাধ্যমে প্রায় বিয়াল্লিশ হাজার এবং পয়তাল্লিশ হাজার টাকা মূল্যের দুটি নতুন রিক্সা অসহায় ব্যক্তিদের দান করেছেন, যাতে তারা স্বাবলম্বী হতে পারেন। এই রিক্সা মিস্ত্রীর মানবিকতার গল্পটি আজ সমগ্র দেশজুড়ে বিস্ময়কর উদাহরণ হয়ে দাঁড়িয়েছে, যা প্রতিটি মানুষকে পরোপকারে উদ্বুদ্ধ করবে।






