গভীর রাতে সাদা পোশাকে নামাজ! জ্বিন ভেবে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আতঙ্ক

অসুস্থ মেয়েকে ডাক্তার দেখাতে এসে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সড়কে নামাজ পড়ছিলেন বাবা। সাদা পোশাক পরিহিত সেই ব্যক্তিকে রাতের আধারে রাস্তার মাঝখানে নামায পড়তে দেখে জ্বিন ভেবে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে গোটা ক্যাম্পাসে।
রাতের আধারে যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাস কিছুটা নিস্তব্ধ হয়ে আসছিলো, ঠিক তখনই নীলক্ষেত থেকে টিএসসি অভিমুখী সড়কের পাশে আইল্যান্ডের ওপর শুভ্র পোশাকে এক ব্যক্তিকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেন কয়েকজন পথচারী ও শিক্ষার্থী। দূর থেকে তার স্থির হয়ে দাঁড়িয়ে থাকা এবং বিশেষ ভঙ্গিমায় ইবাদতে মগ্ন হওয়ার দৃশ্যটি আধো আলো-ছায়ায় এক রহস্যময় পরিস্থিতির জন্ম দেয়। আধুনিক যুগের উন্নত স্মার্টফোনের ক্যামেরায় সেই দৃশ্য বন্দি হতে সময় লাগেনি। মুহূর্তেই সেই ভিডিওটি বিভিন্ন গ্রুপ ও পেজে ছড়িয়ে পড়লে ‘ক্যাম্পাসে জ্বিন দেখা গেছে’ মর্মে এক ভীতিসঞ্চারী পরিবেশ তৈরি হয়।
ভিডিওটিতে দেখা যায়, রাস্তার মাঝখানে ডিভাইডারের ওপর শুভ্র পোশাক পরে একাগ্রচিত্তে নামাজ পড়ছেন এক ব্যক্তি। গভীর রাতে এমন এক নির্জন স্থানে কোনো সাধারণ মানুষের উপস্থিতি এবং তার নামাজের ধরন দেখে অনেকেই একে অতিপ্রাকৃত ঘটনা বলে ধরে নেন। বিশেষ করে সাদা রঙের পোশাক এবং দীর্ঘক্ষণ স্থির থাকার বিষয়টি সাধারণ শিক্ষার্থীদের মাঝে এক ধরনের মনস্তাত্ত্বিক ভয় ছড়িয়ে দেয়।
মানুষ যখনই কোনো কিছুর যৌক্তিক ব্যাখ্যা খুঁজে পায় না, তখনই অলৌকিক বিশ্বাসের আশ্রয় নেয়। আমাদের সমাজের গভীরে গেঁথে থাকা জ্বিন-পরীর বিশ্বাস এই ভয়কে আরও উস্কে দিয়েছিলো। অনেক শিক্ষার্থী ভিডিওর নিচে মন্তব্য করতে শুরু করেন, এটি নিশ্চিতভাবেই কোনো রহস্যময় সত্তা, কারণ সাধারণ মানুষ কেন মাঝরাস্তায় এমনভাবে নামাজ পড়বে!
তবে এই ভয়ের রেশ কাটতে খুব বেশি সময় লাগেনি। অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে এক হৃদয়বিদারক তথ্য। জানা যায়, ঐ ব্যক্তি আদতে কোনো রহস্যময় বা অলৌকিক কিছু নন, বরং একজন দুখী বাবা। তার মেয়ে মারাত্মক অসুস্থ হয়ে কাছের এক হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ছিল। মেয়ের জীবন বাঁচানোর আকুতি নিয়ে তিনি আল্লাহর দরবারে সাহায্য চাইছিলেন। হাসপাতালের ভেতরে পর্যাপ্ত জায়গা না থাকায় তিনি ক্যাম্পাসের সেই শান্ত রাস্তার এক কোণকেই বেছে নিয়েছিলেন সৃষ্টিকর্তার সান্নিধ্য পাবার জন্য। তিনি হয়তো জানতেনও না যে, তার এই অসহায়ত্বের প্রার্থনাটি অন্যদের চোখে ভয়ের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
আমাদের সমাজে জ্বিন নিয়ে এক ধরনের মজ্জাগত বিশ্বাস ও ভয় কাজ করে। নির্জন রাতে সাদা পোশাকের কাউকে দেখলে কিংবা অস্বাভাবিক আচরণ দেখলে সাধারণ মানুষ প্রথমেই সেটিকে কোনো অতিপ্রাকৃত ঘটনার সঙ্গে মিলিয়ে ফেলে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মতো উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠানেও যখন এমন ঘটনা নিয়ে আতঙ্ক ছড়ায়, তখন তা আমাদের লোকজ বিশ্বাসের গভীরতাকেই প্রকাশ করে। অথচ সেই রাতে ঐ ব্যক্তি যখন স্রষ্টার কাছে মেয়ের রোগমুক্তির প্রার্থনা করছিলেন, তখন তিনি ছিলেন পৃথিবীর সবচেয়ে অসহায় একজন মানুষ। তাঁর শুভ্র পোশাকটি ছিল পবিত্রতার প্রতীক, অথচ মানুষের ধারণার ভুলে তা হয়ে উঠেছিল আতঙ্কের উৎস।
এই ঘটনাটি আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিলো, সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে কোনো কিছু যাচাই না করে ছড়িয়ে দেওয়া কতটা বিভ্রান্তি তৈরি করতে পারে। একজন বাবা যখন তার সন্তানের জন্য কাঁদছিলেন, তখন একদল মানুষ দূর থেকে ভিডিও করে সেটিকে ‘জ্বিন’ বলে চালিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছিলো। পরে যখন আসল সত্য সামনে আসে, তখন অনেকের মধ্যেই অনুশোচনা বোধ কাজ করে।
ক্যাম্পাসের সেই রাতটি শেষ পর্যন্ত জ্বিন আতঙ্কের নয়, এক বাবার নীরব প্রার্থনা আর পরম মমতার গল্প হয়েই ক্যাম্পাসের শিক্ষার্থীদের মনে থেকে যাবে। এই চাঞ্চল্যকর ঘটনাটি প্রমাণ করে, অন্ধকার রাতে যা কিছু সাদা দেখায়, তা সবসময় ভয়ঙ্কর কিছু নয়; কখনও কখনও তা হতে পারে পৃথিবীর সবচেয়ে নিঃস্বার্থ কোনো মানুষের শুদ্ধতম অনুভূতি। এক বাবার সেই রাতের প্রার্থনা সফল হোক, এমনটাই এখন সবার প্রত্যাশা।






