মন্ত্রণালয়ের নির্দেশনায় স্থবির সিবিএ চুক্তি, জ্বালানি খাতে অস্থিরতার আশঙ্কা

বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের একটি নির্দেশনার কারণে জ্বালানি খাতের রাষ্ট্রায়ত্ত কোম্পানিগুলোতে প্রচলিত কোম্পানি-সিবিএ (কালেক্টিভ বার্গেনিং এজেন্ট) ভিত্তিক দ্বিপক্ষীয় চুক্তি প্রক্রিয়া কার্যত স্থবির হয়ে পড়েছে। এর প্রভাবে দেশের একমাত্র জ্বালানি তেল শোধনাগার ইস্টার্ন রিফাইনারি লিমিটেডে (ইআরএল) শ্রমিক অসন্তোষ তীব্র আকার ধারণ করেছে। একই সঙ্গে বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশনের (বিপিসি) আওতাধীন বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সিবিএ নেতারাও আন্দোলনের হুঁশিয়ারি দিয়েছেন।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, ২০২৫ সালের ২৫ ফেব্রুয়ারি জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের এক নির্দেশনায় বলা হয়, পেট্রোবাংলা ও বিপিসির অধীন কোনো প্রতিষ্ঠানে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের জন্য বিদ্যমান বা নতুন আর্থিক সুবিধা বৃদ্ধি সংক্রান্ত প্রস্তাব সরাসরি বাস্তবায়ন করা যাবে না। এ ধরনের প্রস্তাব প্রথমে পেট্রোবাংলা বা বিপিসির মাধ্যমে মন্ত্রণালয়ে পাঠাতে হবে এবং অনুমোদন পাওয়ার পরই তা কার্যকর করা যাবে।
শ্রমিক নেতাদের দাবি, এ নির্দেশনা শ্রম আইনের সঙ্গে সাংঘর্ষিক এবং যৌথ দরকষাকষির স্বীকৃত প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করছে। তারা দ্রুত নির্দেশনা প্রত্যাহার, ঝুলে থাকা দ্বিবার্ষিক চুক্তির অনুমোদন এবং শ্রমিকদের ন্যায্য দাবিদাওয়া বাস্তবায়নের আহ্বান জানিয়েছেন। সবচেয়ে বেশি উত্তেজনা বিরাজ করছে চট্টগ্রামের পতেঙ্গায় অবস্থিত ইস্টার্ন রিফাইনারিতে। সেখানে শ্রমিক-কর্মচারীরা চার দফা দাবিতে আন্দোলন চালিয়ে যাচ্ছেন। দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে দ্বিবার্ষিক চুক্তি বাস্তবায়ন, পার্সোনাল পে চালু, আবাসন সুবিধা নিশ্চিতকরণ এবং পদোন্নতি নীতিমালার সংস্কার।
সিবিএ নেতাদের অভিযোগ, ২০২৩-২৪ সালের দ্বিবার্ষিক চুক্তি শ্রমিক প্রতিনিধি ও কর্তৃপক্ষের মধ্যে আলোচনার মাধ্যমে চূড়ান্ত হলেও মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন না পাওয়ায় তা বাস্তবায়ন সম্ভব হচ্ছে না। এ নিয়ে একাধিক বিক্ষোভ কর্মসূচিও পালন করেছেন শ্রমিকরা।
তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের মে মাসে ইস্টার্ন রিফাইনারি এমপ্লয়িজ ইউনিয়ন ছয় দফা দাবিনামা উত্থাপন করে। পরে শিল্প বিরোধ নিষ্পত্তির লক্ষ্যে একটি নেগোসিয়েশন কমিটি গঠন করা হয়। কয়েক দফা আলোচনার পর ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে উভয় পক্ষ দ্বিবার্ষিক চুক্তির বিষয়ে ঐকমত্যে পৌঁছে। পরবর্তীতে ইআরএলের পরিচালনা পর্ষদ চুক্তিটি অনুমোদন করে। এতে শ্রমিক-কর্মচারীদের জন্য বিশেষ সুবিধা, প্রণোদনা বৃদ্ধি, মোটরসাইকেল ঋণের সীমা বৃদ্ধি, যাতায়াত ভাতা বৃদ্ধি এবং দাপ্তরিক কাজে বাইরে অবস্থানের ক্ষেত্রে ব্যয় প্রতিপূরণের মতো বিভিন্ন সুবিধা অন্তর্ভুক্ত ছিল। পাশাপাশি বেতন স্কেলের সর্বোচ্চ সীমায় পৌঁছানো কর্মচারীদের জন্য মূল বেতনের ওপর ৫ শতাংশ ব্যক্তিগত ভাতা দেওয়ার প্রস্তাবও ছিল।
তবে মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের সময় কিছু সুবিধা বহাল রাখা হলেও ব্যক্তিগত ভাতা এবং বৈদ্যুতিক বাতি সুবিধার মতো কয়েকটি দাবি বাদ দেওয়া হয়। এতে শ্রমিক নেতাদের মধ্যে অসন্তোষ আরও বেড়েছে। ইস্টার্ন রিফাইনারি এমপ্লয়িজ ইউনিয়নের সভাপতি দেওয়ান মোহাম্মদ বিল্লাল হোসেন বলেন, প্রতিষ্ঠানের বোর্ডে অভিজ্ঞ ও উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা রয়েছেন। এতদিন তারাই শ্রমিকদের সমস্যা বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নিতেন। এখন মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন প্রক্রিয়ার কারণে অনেক সুবিধা কমিয়ে দেওয়া হচ্ছে।
তিনি বলেন, দ্রুত সমস্যার সমাধান না হলে আন্দোলন আরও কঠোর হবে। প্রয়োজন হলে কর্মবিরতি ও ধর্মঘটের মতো কর্মসূচিও দেওয়া হতে পারে। এতে দেশের একমাত্র তেল শোধনাগারের উৎপাদন কার্যক্রম ব্যাহত হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক মো. আব্দুর রহমান বলেন, বাংলাদেশ শ্রম আইন অনুযায়ী শ্রমিকদের আর্থিক সুযোগ-সুবিধা যৌথ দরকষাকষির মাধ্যমে নির্ধারণ হওয়ার কথা। কিন্তু নতুন নির্দেশনার কারণে সেই প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হচ্ছে।
সংকট শুধু ইস্টার্ন রিফাইনারিতেই সীমাবদ্ধ নয়। বিপিসির অধীন পদ্মা অয়েল কোম্পানি, মেঘনা পেট্রোলিয়াম, যমুনা অয়েল কোম্পানিসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের শ্রমিক সংগঠন একই ধরনের উদ্বেগ প্রকাশ করেছে। পেট্রোবাংলার অধীন তিতাস গ্যাস, বাখরাবাদ গ্যাস, সিলেট গ্যাস ফিল্ডস ও বাপেক্সের শ্রমিক সংগঠনগুলোর মধ্যেও একই আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। শ্রমিক নেতাদের মতে, রাষ্ট্রায়ত্ত হলেও এসব প্রতিষ্ঠান কোম্পানি আইনের অধীনে পরিচালিত হয় এবং অনেক প্রতিষ্ঠানই আর্থিকভাবে স্বয়ংসম্পূর্ণ। সেখানে প্রতিটি আর্থিক সিদ্ধান্তের জন্য মন্ত্রণালয়ের অনুমোদন বাধ্যতামূলক করা হলে প্রশাসনিক জটিলতা বাড়বে এবং শ্রমিক অসন্তোষ আরও তীব্র হতে পারে।
যমুনা অয়েল লেবার ইউনিয়নের ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক মো. নাসির উদ্দিন বলেন, ইস্টার্ন রিফাইনারির মতো একই সমস্যার মুখোমুখি তাদের প্রতিষ্ঠানও। সমাধান না হলে বৃহত্তর কর্মসূচি ঘোষণা করা হবে। এ বিষয়ে বিপিসির সচিব শাহিনা সুলতানা বলেন, সিবিএ নেতারা বিষয়টি চেয়ারম্যানকে অবহিত করেছেন। যেহেতু নির্দেশনাটি মন্ত্রণালয় থেকে দেওয়া হয়েছে, তাই এ বিষয়ে সিদ্ধান্তও মন্ত্রণালয় থেকেই আসবে।
তবে জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ বিভাগের সচিব মোহাম্মদ সাইফুল ইসলামের বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তার কোনো প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।





